কানা রাজার সুড়ঙ্গ ভ্রমণ গাইড : রহস্যময় আঁধার মানিকের ইতিহাস ও যাতায়াত খরচ।
কক্সবাজারের পর্যটন মানচিত্রে সমুদ্রের বিশালতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস আর রহস্যময় এক গুহা, যা স্থানীয় মানুষের কাছে 'কানা রাজার সুড়ঙ্গ' বা 'আঁধার মানিক' নামে পরিচিত। কেউ বলেন এটি উখিয়ায়, কেউ বলেন রামুতে—আসলে এটি উখিয়া ও রামুর সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া এক প্রাচীন স্থাপত্য। আপনি যদি সাধারণ পর্যটনের বাইরে একটু অ্যাডভেঞ্চার এবং ইতিহাসের গন্ধ নিতে চান, তবে এই সুড়ঙ্গ ভ্রমণ আপনার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত।
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে রহস্য ঘেরা এই সুড়ঙ্গ ভ্রমণের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই বিশেষ ব্লগ।
➣ কানা রাজার সুড়ঙ্গের রহস্যময় ইতিহাস:
এই সুড়ঙ্গটি নিয়ে প্রচলিত আছে নানা মুখরোচক কাহিনী। লোককথা অনুযায়ী, ১৭৯৮ সালের দিকে আরাকানের (বর্তমান মায়ানমার) দেশপ্রেমিক রাজা চিন পিয়ান বর্মি রাজের কাছে পরাজিত হয়ে কয়েক হাজার অনুসারীসহ এই অঞ্চলে আশ্রয় নেন। তিনি ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে এবং আত্মরক্ষার্থে পাহাড়ের নিচে এই সুড়ঙ্গটি নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। অনেকের মতে, এই রাজার এক চোখ কানা ছিল, তাই এর নাম হয়েছে 'কানা রাজার সুড়ঙ্গ'। আবার ভেতরে অমূল্য ধনরত্ন থাকতে পারে ভেবে স্থানীয়রা একে 'আঁধার মানিক' বলেও ডাকেন।
➣ কক্সবাজার থেকে যাতায়াত ও ভাড়া:
কানা রাজার সুড়ঙ্গ মূলত কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা নামক এলাকায় অবস্থিত। উখিয়া থেকেও এটি বেশ কাছে।
যাতায়াত মাধ্যম: কক্সবাজার শহরের কলাতলী বা টার্মিনাল থেকে প্রথমে আপনাকে রামু চৌমুহনী স্টেশনে আসতে হবে।
লোকাল বাস ভাড়া: ৩০-৫০ টাকা।
সিএনজি রিজার্ভ (কক্সবাজার থেকে): ৪০০-৬০০ টাকা।
রামু থেকে উখিয়ারঘোনা: রামু চৌমুহনী থেকে আপনাকে সিএনজি নিতে হবে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা বা ড্রোমরঘোনা যাওয়ার জন্য।
সিএনজি ভাড়া: লোকাল ২০-৩০ টাকা, রিজার্ভ ১৫০-২০০ টাকা।
উখিয়া থেকে গেলে: আপনি যদি ইনানী বা উখিয়াতে থাকেন, তবে সেখান থেকেও সিএনজি নিয়ে উখিয়ারঘোনা গ্রামে সরাসরি যাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে ২০০-৩০০ টাকার মতো।
➣ সুড়ঙ্গের ভেতর কী দেখবেন?
পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানোর পর আপনাকে কিছুটা পথ হেঁটে ঝোপঝাড় পেরিয়ে সুড়ঙ্গের মুখে যেতে হবে।
প্রবেশমুখ: সুড়ঙ্গটির প্রবেশমুখ অনেকটা ত্রিভুজাকৃতির এবং মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। প্রায় ২৫ ফুট উঁচু এই প্রবেশপথটি দেখলেই মনে এক ধরণের শিহরণ জাগবে।
ভেতরের গঠন: সুড়ঙ্গটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ ফুট। প্রথম ৬০-৭০ ফুট পর্যন্ত আপনি অনায়াসেই হেঁটে যেতে পারবেন। এরপর দেয়ালগুলো সরু হয়ে আসায় আপনাকে হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে।
বৈঠকখানা: ভেতরে প্রায় ৬০ ফুট যাওয়ার পর একটি বিশাল কক্ষের মতো জায়গা পাওয়া যায়, যাকে স্থানীয়রা 'বৈঠকখানা' বলেন। এটি প্রায় ২৫ ফুট লম্বা ও প্রশস্ত।
রহস্যময় পথ: এই বৈঠকখানা থেকে আবার চারটি আলাদা সুড়ঙ্গ পথ বের হয়েছে। যার দুটি ওপরের দিকে এবং দুটি নিচের দিকে চলে গেছে। এর শেষ কোথায় তা এখনো কারো জানা নেই।
➣ খাওয়া-দাওয়া ও খরচ:
যেহেতু এটি একটি অত্যন্ত দুর্গম এলাকা এবং এখনো পুরোপুরি পর্যটন বান্ধব হয়ে ওঠেনি, তাই এখানে ভালো মানের রেস্টুরেন্ট আশা না করাই ভালো।
কী খাবেন: রামু চৌমুহনী বা উখিয়া বাজারে ফিরে এসে আপনাকে লাঞ্চ করতে হবে। সেখানে স্থানীয় খাবারের হোটেলগুলোতে দেশি মুরগি, সামুদ্রিক মাছ এবং ভর্তা-ভাত পাওয়া যায়।
খরচ: জনপ্রতি ১৫০-২৫০ টাকার মধ্যে তৃপ্তি করে খাওয়া যাবে।
টিপস: সুড়ঙ্গে প্রবেশের আগে সাথে অবশ্যই শুকনা খাবার এবং পর্যাপ্ত পানির বোতল রাখবেন। কারণ পাহাড়ের ভেতর তৃষ্ণা পাওয়া স্বাভাবিক।
➣ কোন জায়গায় কী গাড়ি নিয়ে যাবেন ও ভাড়া:
সুড়ঙ্গে পৌঁছানোর শেষ কয়েক কিলোমিটার পথ কিছুটা মেঠো পথ হতে পারে, তাই যানবাহনের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা প্রয়োজন:
রামু চৌমুহনী থেকে উখিয়ারঘোনা: এই পথে যাওয়ার জন্য সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটো সবচেয়ে সেরা মাধ্যম। সিএনজিগুলো সরাসরি পাহাড়ের একদম কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। (ভাড়া রিজার্ভ করলে আসা-যাওয়া ৩০০ টাকার মতো)।
পাহাড়ি পথে যাতায়াত: যদি আপনারা অনেক বড় গ্রুপ হন, তবে কক্সবাজার থেকে সরাসরি চাঁন্দের গাড়ি বা জিপ নিয়ে যেতে পারেন। এতে করে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চলার আসল মজা পাওয়া যায়। (ভাড়া ৩,৫০০-৪,৫০০ টাকা সারাদিনের জন্য)।
বাইক রাইড: যারা একক ভ্রমণ পছন্দ করেন, তারা বাইক নিয়ে যেতে পারেন। কক্সবাজার থেকে সরাসরি বাইকে গেলে সময় কম লাগবে এবং খরচও সাশ্রয় হবে।
➣ বিশেষ সতর্কতা ও টিপস:
টর্চলাইট: সুড়ঙ্গের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, তাই ভালো মানের টর্চলাইট সাথে রাখা বাধ্যতামূলক। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট যথেষ্ট নাও হতে পারে।
পোশাক: সুড়ঙ্গের ভেতর হামাগুড়ি দিতে হতে পারে, তাই ঢিলেঢালা বা আরামদায়ক পোশাক পরুন যা নোংরা হলেও সমস্যা নেই।
নিরাপত্তা: নির্জন এলাকা হওয়ায় একা না গিয়ে অন্তত ৩-৪ জনের গ্রুপ নিয়ে যাওয়া নিরাপদ।
অক্সিজেন: সুড়ঙ্গের অনেক গভীরে অক্সিজেনের অভাব হতে পারে, তাই শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে সাথে সাথে ফিরে আসুন।
কানা রাজার সুড়ঙ্গ আমাদের দেশের এক অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এই রহস্যময় গুহাটি আপনাকে নিয়ে যাবে কয়েকশ বছর আগের ইতিহাসে। যারা একটু ডিফারেন্ট ট্যুর করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই আঁধার মানিক ভ্রমণ হবে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

