সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ডায়েরি: কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন এবং কী খাবেন?
![]() |
| ছবি: সকালে সৈকতে সাইকেল চালাচ্ছে। |
নীল জলরাশি আর অফুরন্ত বাতাসের দেশ সেন্টমার্টিন। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এই সেন্টমার্টিন ভ্রমণ মানেই এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। আপনি যদি কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে আজকের এই আর্টিক্যালটি আপনার জন্য একটি কমপ্লিট গাইড হিসেবে কাজ করবে। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ধাপে ধাপে সবকিছু বর্ণনা করছি।
➣ কক্সবাজার থেকে টেকনাফ:
সেন্টমার্টিন যাওয়ার প্রধান পথ হলো টেকনাফ হয়ে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দূরত্ব প্রায় ৮০-৮৫ কিলোমিটার। জাহাজ ছাড়ার সময় সাধারণত সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা। তাই আপনাকে খুব ভোরে যাত্রা শুরু করতে হবে।
যাতায়াত মাধ্যম: কক্সবাজারের কলাতলী মোড় বা বাস টার্মিনাল থেকে টেকনাফের উদ্দেশে বাস, মাইক্রোবাস বা সিএনজি পাওয়া যায়।
বাস ভাড়া: লোকাল বাসে ভাড়া পড়বে ১৫০-২০০ টাকা। তবে পর্যটকদের জন্য স্পেশাল মাইক্রোবাস বা হাইয়েস পাওয়া যায়, যাতে ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকার মতো পড়ে।
সময়: ভোরে রওনা দিলে ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টার মধ্যে আপনি টেকনাফ দমদমিয়া জাহাজ ঘাটে পৌঁছে যাবেন। পাহাড় আর সাগরের পাশ দিয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণের আনন্দকে দ্বিগুণ করে দেবে।
➣ জাহাজ ভ্রমণ ও টিকিট:
টেকনাফ পৌঁছে আপনাকে উঠতে হবে জাহাজে। মনে রাখবেন, সিজনে অনেক ভিড় থাকে, তাই জাহাজের টিকিট অন্তত ৩-৪ দিন আগে কনফার্ম করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
জাহাজের নাম: কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি ফারহান, আটলান্টিক ক্রুজ বা গ্রিন লাইন (ওয়াটার বাস) অন্যতম জনপ্রিয় জাহাজ।
টিকিট মূল্য (যাওয়া ও আসা): জাহাজের ক্লাস অনুযায়ী টিকিট পাওয়া যায়। ওপেন ডেক বা সাধারণ সিটে আসা-যাওয়ার ভাড়া সাধারণত ৮০০-১০০০ টাকা। আর যদি আপনি একটু লাক্সারি বা এসি কেবিন নিতে চান, তবে ভাড়া ১৫০০ থেকে শুরু করে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সমুদ্রের রোমাঞ্চ: নাফ নদী পেরিয়ে যখন জাহাজ গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করবে, তখন চারপাশের দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। গাঙচিলদের পিছু নেওয়া আর নীল জলরাশির খেলা দেখতে দেখতে ২.৫ থেকে ৩ ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন স্বপ্নের দ্বীপে।
➣ সেন্টমার্টিনের রূপ- যেখানে মন হারিয়ে যায়:
সেন্টমার্টিন ঘাটে নামার পর নীল পানি আর নারকেল গাছের সারি আপনাকে স্বাগত জানাবে। দ্বীপে দেখার মতো বেশ কিছু অসাধারণ জায়গা রয়েছে:
ছেঁড়াদ্বীপ: সেন্টমার্টিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। মূল দ্বীপ থেকে স্পিডবোট বা ট্রলারে করে এখানে যেতে হয়। এখানে প্রবাল পাথরের ছড়াছড়ি এবং পানি এতটাই স্বচ্ছ যে তলার বালু দেখা যায়।
পশ্চিম বিচ (West Beach): সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি সেরা জায়গা। বিকেলে এখানে বসে চা খেতে খেতে সমুদ্রের গর্জন শোনা এক স্বর্গীয় অনুভূতি।
নর্থ বিচ: এখানে পর্যটকদের ভিড় কিছুটা কম থাকে, তাই যারা নিরিবিলি পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি আদর্শ।
নারকেল বাগান: পুরো দ্বীপ জুড়েই ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার নারকেল গাছ। স্থানীয়দের বাগানে ঢুকে ডাব খাওয়ার অভিজ্ঞতা মিস করবেন না।
![]() |
| ছবি: সকালে সৈকতে সাইকেল চালাচ্ছে। |
➣ কী খাবেন সেন্টমার্টিনে?
সেন্টমার্টিন যাবেন আর সামুদ্রিক মাছ খাবেন না, তা তো হয় না! এখানকার খাবারের তালিকায় রাজত্ব করে টাটকা সি-ফুড।
সামুদ্রিক মাছ: কোরাল, রূপচাঁদা, টুনা, লবস্টার (গলদা চিংড়ি), কাঁকড়া এবং সুন্দরী মাছের ফ্রাই বা বারবিকিউ অবশ্যই ট্রাই করবেন।
শুঁটকি: যারা শুঁটকি প্রেমী, তারা লইট্টা বা ছুরি মাছের শুঁটকি ভুনা দিয়ে তৃপ্তি করে ভাত খেতে পারেন।
রাতের বারবিকিউ: প্রায় প্রতিটি হোটেলের সামনেই রাতে মাছের বারবিকিউ আয়োজন করা হয়। পছন্দের মাছ বেছে নিয়ে মশলা মাখিয়ে কয়লার আগুনে পুড়িয়ে খাওয়ার আমেজই আলাদা।
![]() |
| ছবি: বীচে বার বি কিউ এর জনৗ মাছ সাজিয়ে রেখেছে। |
বিশেষ আকর্ষণ: দ্বীপের বিখ্যাত ডাব এবং কুড়া (দেশি মুরগির এক জাত) মাংসের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
➣ থাকার ব্যবস্থা:
সেন্টমার্টিনে এখন অনেক আধুনিক এবং সুন্দর রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। যেহেতু আপনি সমুদ্র উপভোগ করতে যাচ্ছেন, তাই বিচ সাইড হোটেল বেছে নেওয়া ভালো।
➣ সাজেস্টেড কিছু হোটেল ও রিসোর্ট:
নীল দিগন্ত রিসোর্ট: এটি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। খুবই নিরিবিলি এবং এদের কটেজগুলো চমৎকার।
লাবিবা বিলাস: পশ্চিম বিচের একদম কাছে। এখান থেকে সমুদ্রের গর্জন খুব পরিষ্কার শোনা যায়।
মিউজিক ইকো রিসোর্ট: ছেঁড়াদ্বীপের কাছাকাছি এবং বেশ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন।
সায়রী ইকো রিসোর্ট: যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান এবং একটু ভিন্নধর্মী আর্কিটেকচার পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি সেরা।
ড্রিম নাইট রিসোর্ট: বাজেট ফ্রেন্ডলি এবং বিচের খুব কাছে হওয়ায় এটি অনেক জনপ্রিয়।
টিপস: অফ-সিজনে ভাড়া কিছুটা কম থাকলেও, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে রুম পাওয়া কঠিন হয়, তাই আগেই বুকিং দিয়ে রাখা জরুরি।
➣ সেন্টমার্টিন থেকে কক্সবাজার ফেরা:
* ফেরার দিন সাধারণত জাহাজগুলো দুপুর ৩টা বা সাড়ে ৩টায় ঘাট ছাড়ে। তাই আপনাকে ২টার মধ্যেই ঘাটে উপস্থিত হতে হবে।
* জাহাজে করে টেকনাফ পৌঁছাতে সন্ধ্যা ৬টা বেজে যাবে।
* টেকনাফ জাহাজ ঘাটেই অনেক বাস কাউন্টার থাকে যা সরাসরি কক্সবাজার যায়।
* কক্সবাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা বা ৯টা বাজবে।
➣ কিছু জরুরি পরামর্শ:
* দ্বীপে প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলবেন না, আমাদের পরিবেশ আমাদেরই রক্ষা করতে হবে।
* সাথে সব সময় পাওয়ার ব্যাংক এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখবেন।
* প্রবাল পাথর বা ঝিনুক কুড়িয়ে সাথে আনা আইনত দণ্ডনীয়, তাই এ থেকে বিরত থাকুন।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণ মানেই একরাশ সতেজতা। নীল পানির সেই স্মৃতি আপনার মনে গেঁথে থাকবে অনেক দিন।
.jpg)

