পাথুরে সমুদ্র সৈকত ইনানী ভ্রমণ: মেরিন ড্রাইভ দিয়ে যাওয়ার খরচ ও পূর্ণাঙ্গ গাইড।
কক্সবাজারের কথা বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে জনাকীর্ণ সমুদ্র সৈকত। কিন্তু আপনি যদি একটু শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং পাথুরে সমুদ্রের স্বাদ নিতে চান, তবে আপনার গন্তব্য হওয়া উচিত ইনানী বিচ। পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও সুন্দর মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে ইনানী যাওয়ার অভিজ্ঞতা এক কথায় অসাধারণ। যারা কক্সবাজার মূল শহর থেকে দূরে একদিনের জন্য কোথাও হারিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য আজকের এই ইনানী ভ্রমণ গাইড।
➣কক্সবাজার শহর থেকে ইনানী আসা-যাওয়ার মাধ্যম ও ভাড়া:
কক্সবাজার শহর থেকে ইনানী বিচের দূরত্ব প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার। মেরিন ড্রাইভ হয়ে যাওয়ার পথে আপনি একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি দেখতে পাবেন।
সিএনজি (রিজার্ভ): যদি পরিবার নিয়ে প্রাইভেটলি যেতে চান, তবে সিএনজি রিজার্ভ করা সবচেয়ে ভালো। আসা-যাওয়া এবং ১-২ ঘণ্টা সেখানে অপেক্ষার জন্য ভাড়া পড়বে ৮০০-১,০০০ টাকা।
ইজিরাইডার (টমটম): কলাতলী বা সুগন্ধা মোড় থেকে ইজিরাইডার রিজার্ভ করা যায়। তবে এটি একটু ধীরগতির। আসা-যাওয়া ভাড়া পড়বে ৬০০-৮০০ টাকা।
চাঁন্দের গাড়ি (জিপ): যদি আপনারা ১০-১২ জনের গ্রুপ হন, তবে চাঁন্দের গাড়ি বা জিপ সবচেয়ে আরামদায়ক। ইনানী পর্যন্ত আসা-যাওয়ার জন্য ভাড়া পড়বে ৩,০০০-৪,৫০০ টাকা।
বাইক রাইড: আপনি চাইলে বাইক ভাড়ায় নিতে পারেন। সারাদিনের জন্য বাইক ভাড়া ১,০০০-১,৫০০ টাকা (তেল খরচ আলাদা)। মেরিন ড্রাইভে বাইক চালানো এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
লোকাল বাস/জিপ: শহর থেকে লোকাল জিপ বা ছোট বাসে করেও যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৮০-১০০ টাকা।
➣ইনানীতে দেখার মতো স্পটসমূহ:
ইনানী ভ্রমণের মূল আনন্দই হলো এর যাত্রা পথে এবং বিচে। এখানে দেখার মতো বিশেষ কিছু পয়েন্ট হলো:
ইনানী পাথুরে সৈকত (Inani Coral Beach): ইনানীর প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রবাল পাথর। জোয়ারের সময় পাথরগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়, কিন্তু ভাটার সময় সেগুলো জেগে ওঠে। পাথরের ওপর বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখার অনুভূতি আপনাকে সেন্টমার্টিনের কথা মনে করিয়ে দেবে।
মেরিন ড্রাইভ রোড: ইনানী যাওয়ার মূল পথটিই একটি দর্শনীয় স্থান। ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের একপাশে পাহাড় আর অন্যপাশে সমুদ্র। পথে পথে নারিকেল ও ঝাউ গাছের সারি আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে।
পাটুয়ারটেক সৈকত: ইনানী থেকে একটু সামনে গেলেই পাটুয়ারটেক। এখানকার পাথরগুলো আরও বেশি বড় এবং পানির স্বচ্ছতা ইনানীর চেয়েও কিছুটা বেশি। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি একটি চমৎকার নির্জন জায়গা।
হিমছড়ি (ফিরতি পথে): ইনানী থেকে ফেরার পথে আপনি হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ঘুরে দেখতে পারেন। পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্রের বিশালতা দেখা এবং হিমছড়ির ছোট ঝরনাটি দেখা আপনার ট্যুরকে পূর্ণতা দেবে।
➣ইনানীতে খাওয়া-দাওয়া ও খরচ:
ইনানী বিচের আশেপাশে এবং যাওয়ার পথে অনেক ভালো মানের রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিচের পাশেই ছোট ছোট দোকানে ফ্রেশ সি-ফুড পাওয়া যায়।
* বিচ সাইড সি-ফুড: ইনানীতে কাঁকড়া ফ্রাই, রূপচাঁদা বা কোরাল মাছের বারবিকিউ খুবই জনপ্রিয়।
খরচ: কাঁকড়া ফ্রাই ১০০-২০০ টাকা, মাছের সাইজ অনুযায়ী ২৫০-৬০০ টাকা।
* দুপুরের খাবার: ইনানীতে 'ইনানী রয়েল রিসোর্ট' বা 'প্যারাসাইড রিসোর্ট'-এর রেস্টুরেন্টে ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়।
খরচ: ভাত, ডাল, সবজি আর সামুদ্রিক মাছ দিয়ে প্যাকেজ নিলে জনপ্রতি ২৫০-৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।
* ডাব ও চা: বিচে বসে ডাব খেতে পারেন, যার দাম ৫০-৭০ টাকা।
➣কোন জায়গায় কী গাড়ি নিয়ে যাবেন ও ভাড়া:
ইনানী ট্যুরটিকে আনন্দদায়ক করতে আপনাকে ধাপে ধাপে যানবাহন নির্বাচন করতে হবে:
কক্সবাজার শহর থেকে যাত্রা: শহর থেকে ইনানী যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সেরা মাধ্যম হলো খোলা জিপ বা চাঁন্দের গাড়ি। এতে করে মেরিন ড্রাইভের বাতাস এবং দৃশ্য সবচেয়ে ভালো উপভোগ করা যায়। (ভাড়া ৩,৫০০-৪,০০০ টাকা রিজার্ভ)।
পাটুয়ারটেক ভ্রমণ: আপনি যদি ইনানী পর্যন্ত ইজিরাইডারে যান, তবে সেখান থেকে পাটুয়ারটেক যেতে আরও ৫০-১০০ টাকা টমটম ভাড়া দিতে হবে।
হিমছড়ি স্টপেজ: ফেরার পথে যদি হিমছড়ি পাহাড় বা ঝরনা দেখতে নামেন, তবে আপনার রিজার্ভ করা গাড়িকে আগেই বলে রাখতে হবে। সাধারণত জিপ বা সিএনজি ড্রাইভাররা ২০-৩০ মিনিট অপেক্ষার জন্য অতিরিক্ত কোনো টাকা নেয় না যদি আগেই কথা বলে নেন।
➣একদিনের পারফেক্ট ট্যুর প্ল্যান:
আপনার সুবিধার জন্য একটি রুট ম্যাপ দিয়ে দিচ্ছি:
সকাল ১০:০০: কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে ইনানীর উদ্দেশ্যে রওনা।
সকাল ১১:০০: ইনানী বিচে পৌঁছানো। ভাটার সময় হলে পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানো এবং স্বচ্ছ পানিতে গোসল করা।
দুপুর ১:৩০: ইনানীর কোনো রেস্টুরেন্টে সামুদ্রিক মাছ দিয়ে তৃপ্তি করে লাঞ্চ।
বিকেল ৩:০০: ইনানী থেকে ২-৩ কিমি দূরে পাটুয়ারটেক বিচ ঘুরে দেখা।
বিকেল ৪:৩০: ফিরতি পথে হিমছড়ি পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা এবং সমুদ্রের প্যানোরামিক ভিউ নেওয়া।
বিকেল ৫:৩০: মেরিন ড্রাইভের কোনো এক নির্জন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা।
সন্ধ্যা ৭:০০: কক্সবাজার শহরে প্রত্যাবর্তন।
➣ ভ্রমণের কিছু জরুরি টিপস:
জোয়ার-ভাটার খবর: ইনানী ভ্রমণের আগে অবশ্যই জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নেবেন। ভাটার সময় না গেলে পাথুরে সৌন্দর্য দেখা সম্ভব হবে না।
সানস্ক্রিন ও ছাতা: মেরিন ড্রাইভে রোদ অনেক কড়া থাকে, তাই সাথে ছাতা, রোদচশমা ও সানস্ক্রিন রাখবেন।
পরিবেশ রক্ষা: পাথরের ফাঁকে চিপসের প্যাকেট বা প্লাস্টিক ফেলবেন না। প্রবাল পাথর তুলে আনা দণ্ডনীয় অপরাধ, তাই প্রকৃতিকে প্রকৃতির জায়গায় থাকতে দিন।
কক্সবাজারের যান্ত্রিকতা ছেড়ে একদিনের এই ইনানী ভ্রমণ আপনার মনে প্রশান্তি এনে দেবে। সমুদ্রের সাথে পাহাড়ের এই মিতালি আপনাকে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করবে।


