নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন পর্যটন লেক ভ্রমণ গাইড ২০২৬: যাতায়াত ভাড়া ও পূর্ণাঙ্গ ট্যুর প্ল্যান।
![]() |
| ছবি: নাইক্ষ্যংছড়ি লেক |
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে শান্ত জলের লেক আর মেঘের আনাগোনা দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে। কক্সবাজারের একদম পাশেই অবস্থিত এই উপজেলাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার। আর নাইক্ষ্যংছড়ির প্রধান আকর্ষণ হলো উপবন পর্যটন লেক। কৃত্রিম লেক হলেও এর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনাকে পাহাড়ি অরণ্যের নির্জনতা আর প্রশান্তি দেবে। যারা কক্সবাজারের সমুদ্র দেখে একটু পাহাড়ের ছোঁয়া পেতে চান, তাদের জন্য একদিনের এই নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক ভ্রমণ হবে নিখুঁত একটি পরিকল্পনা।
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক ভ্রমণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ গাইডটি নিচে তুলে ধরছি:
➣ নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক যাতায়াত ও ভাড়া:
কক্সবাজার শহর বা চট্টগ্রাম থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি যাওয়ার পথটি অত্যন্ত সহজ।
কক্সবাজার থেকে: কক্সবাজার শহরের কলাতলী বা বাস টার্মিনাল থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি যাওয়ার সরাসরি কোনো বাস নেই। আপনাকে প্রথমে রামু আসতে হবে।
কক্সবাজার থেকে রামু যাওয়ার লোকাল বাস বা সিএনজি ভাড়া: ৩০-৫০ টাকা।
রামু থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি: রামুর চৌমুহনী স্টেশন থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি যাওয়ার সরাসরি সিএনজি পাওয়া যায়।
সিএনজি ভাড়া (লোকাল): জনপ্রতি ৮০-১০০ টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে: চট্টগ্রাম থেকে যারা আসতে চান, তারা সরাসরি রামুগামী বাসে উঠতে পারেন। বাস ভাড়া পড়বে ৩৫০-৪৫০ টাকার মধ্যে।
➣ উপবন পর্যটন লেকে দেখার মতো স্পটসমূহ:
নাইক্ষ্যংছড়ি পৌঁছে আপনি যখন উপবন লেকে প্রবেশ করবেন (প্রবেশ ফি ২০-৩০ টাকা), তখন আপনার জন্য অপেক্ষা করবে চমৎকার কিছু দৃশ্য:
ক. বিশাল কৃত্রিম লেক: পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা এই লেকটি পর্যটন কেন্দ্রের প্রাণ। লেকের শান্ত নীল জলরাশি আর তার ওপর পাহাড়ের প্রতিফলন আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে।
![]() |
| ছবি: নাইক্ষ্যংছড়ি লেক |
খ. ঝুলন্ত ব্রিজ: লেকের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে একটি সুন্দর ঝুলন্ত সেতু। এই সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং চারপাশের দৃশ্য দেখা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
গ. প্যাডেল বোট ও নৌভ্রমণ: লেকের জলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে প্যাডেল বোট। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো আপনাকে পাহাড়ের খুব কাছে নিয়ে যাবে।
ঘ. পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও পিকনিক স্পট: পাহাড়ের ওপর একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে, যেখান থেকে পুরো নাইক্ষ্যংছড়ি শহর এবং লেকের প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। এছাড়া পুরো এলাকাটি বনভোজন বা পিকনিকের জন্য খুব জনপ্রিয়।
![]() |
| ছবি: নাইক্ষ্যংছড়ি লেকের উপর ঝুলন্ত সেতু |
➣ খাওয়া-দাওয়া ও খরচ:
নাইক্ষ্যংছড়ি একটি উপজেলা শহর হওয়ায় এখানে খাবারের দাম বেশ সাশ্রয়ী। লেকের ভেতরে ছোট ছোট নাস্তার দোকান আছে, তবে দুপুরের খাবারের জন্য শহরের ভেতরে যাওয়াই ভালো।
কী খাবেন: স্থানীয় হোটেলগুলোতে টাটকা দেশি মুরগি, পাহাড়ি সবজি, বাঁশ কোঁড়ল (মৌসুম অনুযায়ী) এবং দেশি মাছের তরকারি পাওয়া যায়।
খাবার খরচ: * দুপুরের খাবার: সাধারণ মানের হোটেলে ভাত, ডাল, সবজি আর মুরগি বা মাছ দিয়ে খেলে জনপ্রতি ১২০-২০০ টাকার মধ্যে রাজকীয়ভাবে খাওয়া যাবে।
নাস্তা: পাহাড়ি কলা, ডাব (৫০-৬০ টাকা) এবং স্থানীয় চা-নাস্তা ৩০-৫০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।
পানি: ১ লিটার বোতল ২০-৩০ টাকা।
➣ কোন জায়গায় কী গাড়ি নিয়ে যাবেন ও ভাড়া:
নাইক্ষ্যংছড়ি শহর থেকে উপবন লেক খুব বেশি দূরে নয়, তবে সঠিক যান নির্বাচন করলে ভ্রমণ আরামদায়ক হবে:
নাইক্ষ্যংছড়ি শহর থেকে লেক: নাইক্ষ্যংছড়ি বাজার বা বাস স্ট্যান্ডে নামার পর উপবন লেকে যাওয়ার জন্য প্রধান মাধ্যম হলো ব্যাটারিচালিত অটো বা সিএনজি।
ভাড়া: লোকাল ভাড়া ১০-২০ টাকা। পুরো অটো রিজার্ভ করলে ৫০-৮০ টাকায় সরাসরি লেকের গেটে পৌঁছে দেবে।
পাহাড়ি এলাকায় ঘোরার জন্য: আপনি যদি লেক ছাড়াও আশেপাশের রাবার বাগান বা সীমান্তের কাছাকাছি কোনো স্পট ঘুরতে চান, তবে মোটরসাইকেল সেরা মাধ্যম।
ভাড়া: ২ জন আরোহীসহ ১ ঘণ্টার জন্য ১৫০-২০০ টাকা ভাড়া নিতে পারে।
রিজার্ভ জিপ (চাঁন্দের গাড়ি): যদি আপনারা ১০-১৫ জনের গ্রুপ হন, তবে কক্সবাজার বা রামু থেকে সরাসরি চাঁন্দের গাড়ি রিজার্ভ করে নিতে পারেন।
ভাড়া: রামু থেকে আসা-যাওয়ার জন্য ২,৫০০-৩,৫০০ টাকা খরচ হতে পারে।
➣ একদিনের আদর্শ ভ্রমণ পরিকল্পনা:
সকাল ৮:৩০: কক্সবাজার থেকে রামুর উদ্দেশ্যে যাত্রা।
সকাল ৯:৩০: রামু থেকে নাইক্ষ্যংছড়িগামী বাসে বা সিএনজিতে চড়ে বসা। পথের দুই পাশের পাহাড় আর আঁকাবাঁকা রাস্তা উপভোগ করা।
সকাল ১১:০০: নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকে প্রবেশ। ঝুলন্ত ব্রিজ এবং লেকের নৌকায় সময় কাটানো।
দুপুর ১:৩০: নাইক্ষ্যংছড়ি বাজারে ফিরে এসে পাহাড়ি স্বাদের দুপুরের খাবার গ্রহণ।
বিকেল ৩:০০: কাছের কোনো রাবার বাগান বা পাহাড়ি ঝরনা (যদি থাকে) ঘুরে দেখা।
বিকেল ৪:৩০: রামুর উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরা।
সন্ধ্যা ৬:৩০: কক্সবাজার শহরে প্রত্যাবর্তন।
➣ প্রয়োজনীয় টিপস:
সময় জ্ঞান: পাহাড়ের রাস্তা সন্ধ্যার পর খুব একটা নিরাপদ নয়, তাই চেষ্টা করবেন বিকেল ৫টার মধ্যে ফিরতি গাড়ি বা সিএনজি ধরতে।
পোশাক: পাহাড়ি রাস্তায় বা সিড়ি বাইতে হতে পারে, তাই আরামদায়ক কেডস বা গ্রিপ জুতা পরুন।
পরিবেশ: লেকের পানিতে কোনো প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলবেন না।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন পর্যটন লেক আপনাকে সমুদ্রের নোনা জল থেকে একটু বিরতি দিয়ে পাহাড়ের শীতল সজীবতায় সিক্ত করবে। অল্প সময়ে ও কম খরচে পাহাড়ি সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে এই ভ্রমণটি আপনার ডায়েরিতে সেরা একটি দিন হয়ে থাকবে।


.jpg)