ঘুমধুম আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্ম ভ্রমণ গাইড।
কক্সবাজার ভ্রমণে এসে নীল সমুদ্র আর বালুকাময় সৈকত তো অনেক দেখা হলো! কিন্তু আপনি কি জানেন, কক্সবাজারের একদম কাছেই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে লুকিয়ে আছে এক টুকরো আমাজন? আমি বলছি ঘুমধুম আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্ম (Akij Wildlife Farm) এর কথা। বিশাল আয়তনের এই খামারে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, কৃত্রিম লেক আর পাহাড়ের মিতালি আপনাকে এক অন্যরকম অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ দেবে। যারা প্রকৃতিপ্রেমী এবং একটু নিরিবিলি পরিবেশে বন্যপ্রাণী ও সবুজের সান্নিধ্য পেতে চান, তাদের জন্য আজকের এই পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ গাইড।
➣কক্সবাজার শহর থেকে ঘুমধুম আকিজ ফার্ম যাতায়াত ও ভাড়া:
কক্সবাজার শহর থেকে ঘুমধুম আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্মের দূরত্ব প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার। এটি মূলত বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় অবস্থিত হলেও কক্সবাজার থেকে উখিয়া হয়ে এখানে যাওয়া সবচেয়ে সহজ।
যাতায়াত মাধ্যম: কক্সবাজারের কলাতলী বা বাস টার্মিনাল থেকে উখিয়াগামী বাসে প্রথমে উঠতে হবে। উখিয়া গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোতে ঘুমধুম যেতে হয়।
বাস ভাড়া: কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত লোকাল বাসে ভাড়া পড়বে ৬০-৮০ টাকা।
সিএনজি (উখিয়া থেকে ঘুমধুম): উখিয়া বাজার থেকে আকিজ ফার্ম পর্যন্ত লোকাল সিএনজিতে ভাড়া পড়বে ৩০-৫০ টাকা। আর যদি পুরো সিএনজি রিজার্ভ নেন তবে ১৫০-২০০ টাকায় সরাসরি ফার্মের গেটে পৌঁছে দেবে।
সরাসরি রিজার্ভ (কক্সবাজার থেকে): যদি পরিবার বা বড় গ্রুপ নিয়ে যেতে চান, তবে কক্সবাজার থেকে সরাসরি সিএনজি বা জিপ রিজার্ভ করা বুদ্ধিমানের কাজ। আসা-যাওয়া এবং সারাদিনের জন্য সিএনজি ভাড়া ১,২০০-১,৫০০ টাকা এবং চাঁন্দের গাড়ি বা জিপ ৩,৫০০-৪,৫০০ টাকার মতো পড়তে পারে।
➣আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্মে কী কী দেখবেন?
এটি সাধারণ কোনো চিড়িয়াখানা নয়, বরং এটি একটি আধুনিক বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ও খামার। এখানে আপনি যা যা উপভোগ করতে পারবেন:
বন্যপ্রাণীর মেলা: এখানে বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ (বিশেষ করে চিত্রা হরিণ), অজগর সাপ, বিভিন্ন প্রজাতির বাঁদর, হনুমান এবং বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা যায়।
বিশাল লেক: ফার্মের ভেতরে বিশাল একটি কৃত্রিম লেক আছে। লেকের চারপাশে সবুজ পাহাড়ের ছায়া আপনাকে মুগ্ধ করবে।
রাবার ও ফলের বাগান: আকিজ গ্রুপের বিশাল রাবার বাগান এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফলের বাগান এই ফার্মের অন্যতম আকর্ষণ। সারিবদ্ধ রাবার গাছের ফাঁক দিয়ে হাঁটা এক অনন্য অনুভূতি।
পাখি পর্যবেক্ষণ: এখানে অনেক নাম না জানা বন্য পাখির কলকাকলি শোনা যায়। যারা ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি স্বর্গ।
প্রকৃতি ও পাহাড়: পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা রাস্তা আর শান্ত পরিবেশ আপনাকে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি দেবে।
➣ খাওয়া-দাওয়া ও খরচ:
আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্মের ভেতরে বা একদম কাছে খুব বড় রেস্টুরেন্ট নেই, তবে উখিয়া বা ঘুমধুম বাজারে খাবারের ভালো ব্যবস্থা আছে।
কী খাবেন: স্থানীয় রেস্টুরেন্টে আপনি টাটকা দেশি মুরগি, পাহাড়ি সবজি এবং শুঁটকি ভর্তার স্বাদ নিতে পারেন। এছাড়া উখিয়া বাজারে সামুদ্রিক মাছের আইটেমও পাওয়া যায়।
খরচ: জনপ্রতি ১৫০-২৫০ টাকার মধ্যে মানসম্মত দুপুরের খাবার (লাঞ্চ) সেরে নেওয়া সম্ভব।
স্ন্যাকস: ফার্মের ভেতরে ঘোরার সময় সাথে হালকা শুকনো খাবার এবং পানির বোতল রাখা জরুরি। একটি পানির বোতল ২০ টাকা এবং বিস্কুট বা কেক ১০-৩০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে।
ডাব: উখিয়া বা ঘুমধুম রোডে প্রচুর ডাব পাওয়া যায়, যা পাহাড়ি তৃষ্ণা মেটাতে দারুণ। দাম পড়বে ৪০-৬০ টাকা।
➣কোন জায়গায় কী গাড়ি নিয়ে যাবেন ও ভাড়া:
ফার্মের অবস্থানটি কিছুটা পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় সঠিক যান নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ:
মেরিন ড্রাইভ হয়ে গেলে: আপনি যদি কক্সবাজার থেকে ইনানী হয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে যেতে চান, তবে মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার সেরা। ইনানী থেকে উখিয়া হয়ে ঘুমধুম যাওয়ার পথটি অত্যন্ত সুন্দর। বাইক ভাড়া সারাদিনের জন্য ১,০০০-১,৫০০ টাকা।
উখিয়া থেকে ফার্মের ভেতর পর্যন্ত: উখিয়া স্টেশনে নামার পর আকিজ ফার্মের রাস্তাটি কিছুটা সরু ও পাহাড়ি। এখানে যাওয়ার জন্য সিএনজি সবচেয়ে আরামদায়ক। রিজার্ভ নিলে আসা-যাওয়া ও ১-২ ঘণ্টা অপেক্ষার জন্য ৩০০-৪০০ টাকা বাজেট রাখুন।
চাঁন্দের গাড়ি (জিপ): যদি আপনারা ১০-১৫ জন হন, তবে কক্সবাজার থেকে জিপ নিয়ে সরাসরি ফার্মে যাওয়া সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও আনন্দদায়ক হবে। জনপ্রতি খরচ অনেক কমে আসবে।
➣একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা :
সকাল ৯:০০: কক্সবাজার শহর থেকে উখিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা।
সকাল ১০:৩০: উখিয়া পৌঁছে হালকা নাস্তা সেরে সিএনজি নিয়ে ঘুমধুম আকিজ ফার্মের উদ্দেশ্যে যাত্রা।
সকাল ১১:৩০: আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্মে প্রবেশ। হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, অজগর এবং লেকের চারপাশ ঘুরে দেখা।
দুপুর ১:৩০: ঘুমধুম বা উখিয়া বাজারে ফিরে এসে স্থানীয় কোনো হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ।
বিকেল ৩:০০: ফেরার পথে উখিয়ার 'কানা রাজার সুড়ঙ্গ' বা স্থানীয় বৌদ্ধ মন্দিরগুলো দেখে নেওয়া।
বিকেল ৪:৩০: মেরিন ড্রাইভের বাতাস খেতে খেতে সূর্যাস্তের আগে কক্সবাজার শহরে প্রত্যাবর্তন।
➣জরুরি কিছু পরামর্শ:
অনুমতি: আকিজ ফার্মটি একটি বেসরকারি প্রজনন কেন্দ্র, তাই অনেক সময় ভেতরে প্রবেশের জন্য আগে থেকে অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে বা নির্দিষ্ট প্রবেশ ফি দিতে হয়। যাওয়ার আগে বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।
সীমান্ত এলাকা: যেহেতু এটি মায়ানমার সীমান্তের খুব কাছে, তাই কোনোভাবেই সীমান্তের জিরো পয়েন্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না এবং সাথে সবসময় এনআইডি কার্ড (NID) রাখবেন।
পরিবেশ: বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত করবেন না বা তাদের খাবার দেবেন না। বনের শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন।
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের ভিড় থেকে বাঁঁচতে ঘুমধুম আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্ম হতে পারে আপনার জন্য এক দিনের সেরা রিফ্রেশমেন্ট। পাহাড় আর বন্যপ্রাণের এই রোমাঞ্চ আপনার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।

